অ্যাডগার-অ্যালান-পো (জানুয়ারি ১৯, ১৮০৯ – অক্টোবর ৭, ১৮৪৯) একাধারে ছিলেন একজন মার্কিন লেখক, কবি, সম্পাদক এবং সাহিত্য সমালোচক। পো তার লেখা কবিতা, ছোট গল্প এবং বিশেষ করে মৃত্যুর সাথে সম্বন্ধযুক্ত ছোটোগল্প ও রহস্য গল্পগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। পোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং পুরো আমেরিকান সাহিত্যের রোমান্টিসিজমের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি যে সময় ছোটোগল্প লিখতেন সেইসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছোটগল্প লেখকের সংখ্যা ছিল নগন্য। এছাড়াও তিনি গোয়েন্দা কথাসাহিত্যের উদ্ভাবক ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। শুধু তাই নয় সেইসময়ে সাহিত্যের উদীয়মান ধারা বিজ্ঞানকল্পকাহিনীতে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পোই প্রথম মার্কিন লেখক যিনি শুধুমাত্র লেখার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন, ফলত তার জীবন ছিল আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ১৮২৭ সালে তিনি ছদ্মনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এই সময়েই তিনি বেনামে তার সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করতে শুরু করেন। একজন বোস্টোনিয়ান ছদ্মনামে প্রকাশ করেন তামেরলেন এবং অন্যান্য কবিতা (১৮২৭)। এটাই ছিলো তার প্রথম প্রকাশিত সাহিত্যকর্ম। ১৮৩১ সালে যখন পো সামরিক অফিসার হতে ব্যর্থ হন তখন তার কবি ও লেখক হবার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হয়। পো এসময় গদ্য লেখায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তী কয়েক বছর একাধিক সাহিত্য পত্রিকা এবং সাময়িকীতে কাজ করেছেন। তিনি তার নিজস্ব সাহিত্য সমালোচনার স্টাইলের জন্য খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। কাজের জন্য তাকে বাল্টিমোর, ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক সিটি সহ বেশ কয়েকটি শহরে থাকতে হয়। ১৮৩৬ সালে তিনি তার ১৩ বছর বয়সী ফুফাত বোন ভার্জিনিয়া ক্লেমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ভার্জিনিয়া ক্লেম যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৮৪৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৪৪ সালের জানুয়ারিতে পো তার "দ্যা রেভেন" কবিতাটি প্রকাশ করেন যা তাঁকে তাৎক্ষণিক সাফল্য এনে দেয়। এরপর তিনি তার নিজস্বপত্রিকা দ্যা পেন প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেন, কিন্তু দুখঃখজনকভাবে এটি প্রকাশের আগেই ১৯৪৯ সালে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। অনেকে এও মনে করে যে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। পো এবং তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে শুধুমাত্র বিশ্ব সাহিত্যই নয় বরং মহাজাগতিক এবং ক্রিপ্টোগ্রাফির মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলোও প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি এবং তার কাজ নিয়ে অনেক নাটক, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, গান লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তার স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি বাড়িকে জাদুঘর ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও মিস্ট্রি রাইটার্স অফ আমেরিকা প্রতিবছর একটি পুরস্কার প্রদান করে যা এডগার অ্যাওয়ার্ড নামে পরিচিত। পোয়ের সর্বাধিক পরিচিত রচনাগুলো গথিক স্টাইলের। তার এই কাজগুলো জনসাধারণের রুচির সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেখা। তার লেখায় মৃত্যুর কারণ, এর লক্ষণ, পচন, বিকার, পরিণতি, জীবন্ত কবর দেয়া, বিলাপ করা এবং পুনর্জন্ম এই বিষয়গুলোই ফিরে ফিরে এসেছে। তার লেখাগুলোকে অতীন্দ্রিয়বাদের প্রতিক্রিয়া ডার্ক রোমান্টিসিজমের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হলেও এরূপ সংজ্ঞায়িত করাতে পোর ঘোরতর আপত্তি ছিল। পো অতীন্দ্রিয়বাদ চর্চাকারীদের উপহাস করতেন। তবে তিনি তার বন্ধু টমাস হোলি শিভার্সকে লেখা একটি চিঠিতে বলেন যে তিনি শুধু অতীন্দ্রিয়বাদ চর্চার নামে যারা ভন্ডামি করে তাদেরকে ঘৃণা করেন। হরর বা অতঙ্কবাদী ঘরানার লেখা ছাড়াও পো লিখেছেন প্রহসন ও ব্যঙ্গকৌতুকধর্মী রচনা। কৌতুকপ্রদ করার জন্য তিনি লোখায় হাস্যকর বিদ্রুপ ব্যবহার করতেন। পোর প্রথম প্রকাশিত গল্প হলো মেটজেঙ্গারস্টেইন যেটি ছিল একটি হরর স্টোরি। পো এছাড়াও লিখেছেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনী যেখানে বাষ্পচালিত বেলুনের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির কথাও ছিল। পোর তার বেশিরভাগ লেখাই জনমানসের রুচির সাথে সামঞ্জস্য রেখে লিখেছেন। ফলে শেষতক তিনি তার বিজ্ঞানকল্পকাহিনীগুলোর জন্য সিউডোসায়েন্স থেকে জনপ্রিয় উপাদান সংগ্রহ করেন।
সংগৃহিত বই: ২ টি